https://thesylhet.tv/

1028

new

নতুন

সাতকরা : আদি নিবাস থেকে ইতিবৃত্ত

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ ১৯:৩৭
প্রতিবেদক: দ্যা সিলেট ডেস্ক

একটি ফল - যার নাম শুনলেই ভেসে ওঠে সিলেটের পাহাড়, সবুজ প্রকৃতি আর ঐতিহ্যবাহী রান্নার অতুলনীয় ঘ্রাণ।
যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে চলেছে সিলেটের খাদ্যসংস্কৃতি।

বলছিলাম সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সাতকরার কথা।

সাতকরার আদি নিবাস ভারতবর্ষের আসামের পাহাড়ি অঞ্চল। এটি একটি লেবুজাতীয় ফল। এর বৈজ্ঞানিক নাম Citrus macroptera।

একসময় বৃহত্তর সিলেট ছিল আসাম প্রদেশের অংশ। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই সিলেটের পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চলে সাতকরার বিস্তার ঘটে। অনুকূল জলবায়ু ও মাটির কারণে ধীরে ধীরে এটি এই অঞ্চলের অন্যতম পরিচিত ফল হয়ে ওঠে।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যেই সাতকরা সিলেটের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। স্থানীয় বাজার, পারিবারিক ভোজ কিংবা উৎসব—সবখানেই ছিল এর উপস্থিতি।

পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলেও সিলেটের এই সুগন্ধি ফল বিশেষ পরিচিতি লাভ করে এবং অঞ্চলটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

একসময় মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার একটি গ্রামের নামই হয়ে যায় সাতকরা কান্দি। যা প্রমাণ করে, এই ফলের সঙ্গে এলাকার সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। বর্তমানে ওই এলাকায় হাতে গোনা কয়েকটি গাছই টিকে আছে।

ফলে দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে এখন বিপুল পরিমাণ সাতকরা ভারতীয় রাজ্য আসাম ও মেঘালয় থেকে আমদানি করতে হয়।

বর্তমানে সিলেটের জৈন্তাপুর, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, ছাতক, বড়লেখা, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জের পাহাড়ি এলাকায় সাতকরার চাষ হয়ে থাকে।

সাতকরা গাছ দেখতে অনেকটা লেবুগাছের মতো হলেও এটি ২০ থেকে ২৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে।

ফাল্গুন মাসে গাছে ফুল আসে, আর জ্যৈষ্ঠ থেকে আষাঢ়ের মধ্যে ফল সংগ্রহ করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে সিলেটের স্থানীয় উৎপাদন মোট চাহিদার মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ পূরণ করতে পারে। বাকি প্রায় ৭০ শতাংশ সাতকরা আসে ভারতের আসাম ও মেঘালয় থেকে, যার মধ্যে আসামের কাছাড় জেলা অন্যতম প্রধান উৎস।

এই সম্ভাবনাময় ফলের উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীনস্থ জৈন্তাপুর সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্র ২০০৪ সালে একটি জাত 'বারি সাতকরা-১' উদ্ভাবন করেছে।

তবে গবেষকদের মতে, গাছের ধীর বৃদ্ধি, ফল ধারণে দীর্ঘ সময় এবং ফলের সংবেদনশীল প্রকৃতির কারণে অনেক কৃষক ধীরে ধীরে সাতকরা চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

সাতকরার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর মোটা ও সুগন্ধি খোসা।

দীর্ঘ সময় রান্না করলেও এর সুবাস অটুট থাকে। আর এই বৈশিষ্ট্যই সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সাতকরা দিয়ে গরুর মাংসকে এনে দিয়েছে বিশ্বজোড়া পরিচিতি।

তবে সাতকরার গুরুত্ব শুধু স্বাদেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে রয়েছে অধিক সাইট্রিক এসিড। এছাড়া এটি ভিটামিন সি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং খাদ্যআঁশের সমৃদ্ধ উৎস। এতে থাকা প্রাকৃতিক এসেনশিয়াল অয়েল একে অন্যান্য লেবুজাতীয় ফল থেকে আলাদা করেছে।

নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে সাতকরা খাদ্যতালিকায় থাকলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, হজমে সহায়তা করতে এবং শরীরকে অক্সিডেটিভ ক্ষতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে কাজ করে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর চাহিদা বেড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছেও সাতকরা এবং সাতকরার আচার অত্যন্ত জনপ্রিয়।

ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই এসব পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।

এতো সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখনো সাতকরা বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা GI পণ্যের স্বীকৃতি পায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, GI স্বীকৃতি, উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, আধুনিক প্যাকেজিং, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে সাতকরা বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্যে পরিণত হতে পারে।

/*** Link Copy ***/ /*** Link Copy ***/