https://thesylhet.tv/

1371

international

বিদেশ

ক্লাসরুম থেকে রাজপথ - জেন-জির আন্দোলনে অচল পুরো ফ্রান্স!

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:২২
প্রতিবেদক: দ্যা সিলেট ডেস্ক

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ দশা আর শিক্ষক সংকট নিয়ে ফ্রান্সের হাইস্কুল পড়ুয়া জেন-জি শিক্ষার্থীদের শুরু করা আন্দোলন এখন রূপ নিয়েছে এক বিশাল গণবিস্ফোরণে। বিক্ষোভকারীদের স্লোগান -২০২৬ সাল হলো নতুন ১৭৮৯, অর্থাৎ তারা এই আন্দোলনকে ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লবের সাথে তুলনা করছে! কিন্তু কীভাবে একটি সাধারণ ছাত্র আন্দোলন পুরো ফ্রান্সকে অচল করে দিল? চলুন জেনে নেওয়া যাক আন্দোলনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে প্যারিসের শহরতলি ক্রেতেই এবং সেইন-সাঁ-দেনির বিভিন্ন হাইস্কুলে প্রথম এই বিক্ষোভ শুরু হয়। ফরাসি সরকারের নতুন বাজেটে ৬১ বিলিয়ন ইউরো ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা এবং শিক্ষা খাতে ৪ হাজারের বেশি শিক্ষকের পদ বিলুপ্ত করার ঘোষণায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা।  

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ - ক্লাসে গাদাগাদি করে ৩৫-৩৬ জনকে বসতে হয়, ভাঙাচোরা ভবন, শৌচাগারে পানি নেই, এমনকি স্কুলে ইঁদুর ও তেলাপোকার উপদ্রব। এছাড়াও সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ ক্লাসের রুটিন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জটিল অনলাইন সিস্টেম পারকুরসুপ নিয়ে তীব্র মানসিক চাপে ছিল তারা।


হাইস্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সোরবোন ও প্যারিস সিটির মতো নামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। ১ হাজারের বেশি স্কুল অচল হয়ে পড়ে এবং একদিনেই প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। লঁস শহরে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের ব্যবহৃত স্টান গ্রেনেড বিস্ফোরণে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত উড়ে যায়। এই ঘটনা পুরো ফ্রান্সের তরুণ প্রজন্মকে ক্ষিপ্ত করে তোলে এবং পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে।  

পরিস্থিতি সামাল দিতে ৮ অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে জরুরি ভিত্তিতে ৩ হাজার খণ্ডকালীন বা বদলি শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দেন। কিন্তু আন্দোলনকারীরা একে ‘লোকদেখানো’ বলে প্রত্যাখ্যান করে।

শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের যোগদান: শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে রাজপথে নামে ফ্রান্সের প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলোএবং সাধারণ মানুষ। যুক্ত হয় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয়ের ইস্যু। ১৭-১৮ অক্টোবরের ভয়াবহ সহিংসতা: দেশজুড়ে রাস্তায় নামে সাড়ে ৫ লাখ থেকে ৮ লাখ মানুষ। শান্তিপূর্ণ মিছিল রাতে রূপ নেয় ভয়াবহ দাঙ্গায়।  

মধ্যাঞ্চলীয় লিমোজ  শহরে বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ১৪৩ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক টাউন হলের ছাদ ধসে পড়ে। লিওঁ  শহরে পর্যটন কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয় এবং মার্সেই ) শহরের সিটি হলে ঢুকে ভাঙচুর চালায় মুখোশধারীরা। প্যারিসসহ বড় শহরগুলোতে ব্যাংক, সুপারমার্কেট ও বিলাসবহুল দোকানে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চলে।

আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে আরবি ও ফরাসি শব্দের মিশ্রণে তৈরি একটি ব্যতিক্রমী স্লোগান - ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ যার আক্ষরিক ভাবার্থ আল্লাহর নামে শুরু, অন্ধকার।  

শিক্ষার্থীদের ধারণা, স্ন্যাপচ্যাটের প্রাইভেট গ্রুপে ঢুকে তথ্য চুরির উদ্দেশ্যে গোয়েন্দা পুলিশ তরুণদের কথ্য ভাষার নকল করে এই হাস্যকর মেসেজটি পাঠিয়েছিল। পুলিশের সেই ব্যর্থ চেষ্টাকে ব্যঙ্গ করতেই জেন-জি আন্দোলনকারীরা এটিকে তাদের প্রধান স্লোগান বানিয়ে ফেলেছে,যা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। 

প্যারিসের উত্তরে বিক্ষোভ চলাকালে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ১ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের ইট-পাটকেল ও হামলায় এ পর্যন্ত ১ হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন যার মধ্যে কেবল ১৭ অক্টোবরের সংঘর্ষেই আহত হন ৫০০ থেকে ১,০০০ পুলিশ।  

আন্দোলনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক স্কুল শিক্ষার্থী। সর্বশেষ উইকেন্ডের সহিংসতাতেই আটক করা হয়েছে ১,২০০ থেকে ১,৮০০ জনকে।

ক্লাসরুমের সংকট থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন এলিসি প্রাসাদের গদি কাঁপাচ্ছে।ইতিহাস বলছে, ফরাসিদের রাজপথের ক্ষোভ বারবার বদলে দিয়েছে দেশের শাসনব্যবস্থা।একদিকে সরকারের কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে রাজপথ না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে জেন-জি। সব মিলিয়ে,এক চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে এখন গোটা ফ্রান্স।