সভ্যতার আগ্রাসনে যখন আমরা ধরে নিয়েছি আমাদের বনভূমিগুলো ক্রমশ প্রাণহীন হয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই অন্ধকার চিড়ে উঁকি দেয় এই জ্বলজ্বলে চোখ জোড়া! দীর্ঘ বিরতির পর কক্সবাজারের গহীন অরণ্যে এভাবেই নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়েছে 'মেঘলা চিতা' বা ক্লাউডেড লেপার্ড।
গবেষকরা জানাচ্ছেন, এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে মেঘলা চিতার দেখা মিললেও, কক্সবাজারের কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়ার ঘটনা এটাই প্রথম। একই গবেষণায় উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, লজ্জাবতী বানর, উল্টোলেজি বানর, বনবিড়াল, চিতা বিড়ালসহ আরও ২১ প্রজাতির বন্য প্রাণীর সন্ধান মিলেছে।
স্থানীয়ভাবে 'গেছো বাঘ' নামে পরিচিত এই মেঘলা চিতা বড় এবং ছোট বিড়াল প্রজাতির মধ্যে এক অদ্ভুত যোগসূত্র। শরীরের অনুপাতে এদের ক্যানাইন দাঁত বা ছেদন দন্ত বিশাল! তবে ভয়ংকর দর্শনের হলেও, এরা মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মক নয়। এদের প্রধান খাবার বনে থাকা বানর, ইঁদুর ও ছোটখাটো প্রাণী।
কিন্তু প্রকৃতির এই টিকে থাকার লড়াইয়ের চেয়েও বড় এক লড়াইয়ের নাম 'মানুষের নিষ্ঠুরতা'। বন উজাড় হওয়ায় একটু খাবারের খোঁজে বা পথ ভুলে লোকালয়ে এলেই শুরু হয় বিভীষিকা। স্রেফ আতঙ্ক আর গুজবের বশবর্তী হয়ে নিরীহ বন্যপ্রাণীদের পিটিয়ে মারে উন্মত্ত জনতা।
আর যারা জনতার পিটুনি থেকে বেঁচে যায়, তারা পড়ে আরও ভয়াবহ ফাঁদে। বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্রের অন্যতম এক নিরাপদ রুট। কিছুদিন আগেও সীমান্ত গলে ভারতের গুজরাটে পাচার হয়ে গেছে বিরল প্রজাতির দুটি লেমুর।
পাচারকারীরা তো অপরাধী, কিন্তু খোদ সরকারি আশ্রয়ে কেমন আছে আমাদের বন্যপ্রাণীরা? গাজীপুর সাফারি পার্কের ভেতরের গল্পটা আরও করুণ । 'কোয়ারেন্টাইন'-এর নামে একটি বন্যপ্রাণীকে দিনের আলো থেকে সরিয়ে, পায়ে শিকল পরিয়ে টানা ৯ বছর আটকে রাখার মতো রোমহর্ষক ঘটনাও ঘটেছে এখানে।
বর্তমানে বাংলাদেশের একমাত্র মেঘলা চিতাটি রয়েছে কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে, যা ২০২৩ সালে রাঙ্গামাটি থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। আর এবার ইনানীর জঙ্গলে নতুন করে যে মেঘলা চিতার দেখা মিললো, তার ভবিষ্যৎ হয়তো আন্দাজ করতে যাচ্ছে। কক্সবাজারের মেঘলা চিতা হয়তো প্রকৃতির আপন নিয়মে ফিরে এসেছ। তবে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয় যখনই উঁকি দেয় তখন স্বস্তির চাইতে হয়তো দীর্ঘনিঃশ্বাসটাই প্রাধান্য পায়।