গাইবান্ধার প্রধান চারটি নদ-নদীর মধ্যে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বাড়লেও কমছে করতোয়া নদীর পানি। পানি বৃদ্ধি-হ্রাসের এই দোলাচলে জেলার সুন্দরগঞ্জ, সদর, গোবিন্দগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলে তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীতে গত বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে শুরু হওয়া আকস্মিক ভাঙনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে শতাধিক পরিবারের বসতভিটা ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) শনিবারের (১৮ জুলাই) সর্বশেষ তথ্য়নুযায়ী, শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে শনিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
একই সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৬৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে এবং ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১০৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
অন্যদিকে করতোয়া নদীর পানি গোবিন্দগঞ্জের চকরহিমাপুর স্টেশন পয়েন্টে ৩৪ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১৪৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চলতি বন্যা মৌসুমে জেলার কোনো নদ-নদীর পানিই এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
পাউবোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৪ জুলাই তিস্তা নদীর পানি এ বছরের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এরপর পানি দ্রুত কমলেও বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) দুপুর থেকে আবারও বাড়তে শুরু করে। এরই মধ্যে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ লালচামার (ভোরের পাখি) এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙন শুরু হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে কাপাসিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের লালচামার এলাকায় তিস্তার আকস্মিক ভাঙনে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় ১০০ পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়। শনিবার পর্যন্ত এ সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়েছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডেও ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৩০টি পয়েন্টে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে নদীতীরবর্তী অন্তত আট শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি। ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের হাজারো মানুষ।
ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার, কেরানির চর, মিন্টু মিয়ার চর ও বাদামের চর; কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কালির খামার গ্রামের শখের বাজার; হরিপুর ইউনিয়নের চর চরিতাবাড়ী; চন্ডিপুর ইউনিয়নের উত্তর সীচা। এছাড়া সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নের সিধাইল এবং ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বালাসীঘাট, দক্ষিণ রসুলপুর, উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর, ফজলুপুর ইউনিয়নের মধ্য ও দক্ষিণ খাটিয়ামারীর চর এবং চর চৌমোহন এলাকাতেও ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে নতুন করে ভাঙনের কবলে পড়েছে ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী ভূষির ভিটা গ্রাম। স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৯ জুলাই রাতে জিও ব্যাগ ধসে পড়ে তিনটি স্থানে ভাঙন শুরু হয়। এর মধ্যে একটি স্থানে প্রায় ৫০ মিটার, অন্য দুটি স্থানে যথাক্রমে ৩০ ও ২০ মিটার এলাকা দেবে যায়। ধসে যাওয়া তিনটি স্থানের দুটি সরাসরি জনবসতিপূর্ণ এলাকায়।
এছাড়া গোবিন্দগঞ্জের করতোয়া নদীর তীরবর্তী কয়েকটি এলাকাতেও নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বল, উপজেলার ভাঙনকবলিত প্রতিটি এলাকা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
নতুন করে ভাঙনের মুখে পড়া ফুলছড়ি উপজেলার ভূষির ভিটা এলাকায় জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সেখানে পাঁচ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ভাঙনের অন্যান্য স্থানেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রতিরোধকাজ পরিচালনা করা হবে।
এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২০ থেকে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার কয়েকটি জেলায় নদীর পানি সতর্ক সীমা স্পর্শ করতে পারে।
শনিবার (১৮ জুলাই) কেন্দ্রটির সহকারী প্রকৌশলী নুসরাত জাহান জেরিনের স্বাক্ষরিত প্রধান অববাহিকা ও জোনভিত্তিক নদ-নদীর পরিস্থিতি ও পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ দিনে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে ২০ থেকে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার কিছু স্থানে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি সতর্ক সীমায় পৌঁছাতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও বন্যা দেখা দিতে পারে।